কৃশানু মজুমদার: 'আজকের দিনেই আমি সেঞ্চুরি করেছিলাম। সেই সেঞ্চুরি বিরাট কোহলিকে উৎসর্গ করলাম', ওয়াঘার ওপার থেকে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্রিকেটার বাসিত আলি। 

আজ ৫ নভেম্বর। কোহলির জন্মদিন। শুভেচ্ছাবার্তায় ভেসে যাচ্ছেন তিনি। পাক মুলুক থেকে বাসিতও ভারতীয় তারকার জন্য একবুক শুভেচ্ছা পাঠালেন। আজকাল ডিজিটালকে বললেন, ''আজ বিরাটের জন্মদিন। দিনটা আমার কাছেও স্পেশাল। আজকের দিনেই ১৯৯৩ সালে আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করেছিলাম।''

শারজায় ৬৭ বলে শতরান হাঁকিয়েছিলেন বাসিত। ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ১২৭ রানে অপরাজিত ছিলেন প্রাক্তন পাক তারকা। তাঁর ব্যাটিং স্টান্স ছিল অনেকটা জাভেদ মিয়াঁদাদের মতো। অনেকেই সেই সময়ে তাঁকে মিয়াঁদাদের ক্লোন বলতেন। বাসিত অবশ্য গ্রেট মিয়াঁদাদের সঙ্গে নিজের তুলনা টানতে রাজি নন।
 

এহেন বাসিত আলি ভারতের তারকা ব্যাটার সম্পর্কে বলছেন, ''অনেক শুভেচ্ছা তোমাকে। ফর্মে ফেরো। রান করো। আজ যারা তোমার সমালোচনা করছে, অস্ট্রেলিয়া সিরিজের পর তারাই তোমার প্রশংসায় মেতে উঠবে।'' জীবন যে এরকমই। কখনও মেঘ, কখনও রৌদ্র। দেশের তারকা ব্যাটারও জানেন তা।
 
বিরাট কোহলি ক্রিকেট রোম্যান্সের নতুন এক অধ্যায়। ক্রিকেট যদি ধর্ম হয়, তিনি তাহলে তার সাক্ষাৎ সাধক। ঘাম-রক্তের পথ অতিক্রম করে যিনি শৌর্য-বীর্যের পোশাক পরিহিত এক নাইট।
একবছর আগে কলকাতার বড় আপন, বড় প্রিয় ইডেন গার্ডেন্সে সেঞ্চুরি করেছিলেন বিরাট। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকান বোলিং ধ্বংস করে ছুঁয়েছিলেন শচীন রমেশ তেণ্ডুলকরের ৪৯টি ওয়ানডে সেঞ্চুরির রেকর্ড। সেদিন কলকাতা কল্লোলিনী হয়ে উঠেছিল জাদুকরের ছোঁয়ায়।
এক বছর পরে সেই দিনেই বিরাট কোহলির দিকে ধেয়ে আসছে সমালোচনার ঢেউ। তিনি রক্তাক্ত হচ্ছেন। নন্দিত বিরাট একইসঙ্গে আজ নিন্দিতও। সদ্য সমাপ্ত নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে বিরাট-ম্যাজিক চলেনি। তাঁর ব্যাট 'বোবা' থেকে গিয়েছে। 'গেল গেল' রব উঠেছে। অবসর নাও বিরাট, এমন নিদান দিয়েছেন কিছু ক্রিকেটবিশেষজ্ঞও।
 
বাসিত অন্য মেরুতে অবস্থান করছেন। বিরাট-অবিচারে ক্ষুব্ধ বাসিত বলছেন, ''যে দলে বিরাটের মতো ব্যাটসম্যান রয়েছে, তাকে ভাল পিচ দেওয়ার দরকার ছিল। গৌতম গম্ভীর সেই পিচ দিল না বিরাটকে। রাহুল দ্রাবিড়ের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া উচিত গম্ভীরের। রোহিত শর্মারও বলা উচিত ছিল পিচ নিয়ে। বিরাটের দোষ নয়, দোষ সেই লোকটার মানসিকতার যে এমন পিচ বানাতে বলেছে।''
বিরাটের প্রতি আগাগোড়াই স্নেহশীল বাসিত। কে বলবে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কে বরফ জমেছে। বন্ধ হয়ে গিয়েছে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। এ তো ভালবাসার ফল্গুধারা বইছে। বাসিত বলছেন, ''অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বিরাট ঘুরে দাঁড়াবেই। মিলিয়ে নেবেন। ওখানে প্রথম ২০-২৫ ওভার সুবিধা পায় বোলাররা। পরে পিচ হয়ে যায় ব্যাটিং বান্ধব। কোকাবুরা বল তাড়াতাড়ি নরম হয়ে যায়। বিরাটকে কেবল ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তাহলেই রান আসবে।''
 
একসময়ে মনে করা হত শচীন তেণ্ডুলকরের অবিশ্বাস্য রেকর্ড ভাঙতে পারেন একমাত্র বিরাট কোহলিই। শচীন ক্রিকেট ঈশ্বর। একসময়ে তিনি ক্রিজে নামা মানেই দেশে নেমে আসত অঘোষিত লকডাউন।
বিরাট ঈশ্বরের আসনে এখনও উপবিষ্ট হননি। কিন্তু ঈশ্বরকে ছোঁয়ার এক মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সবুজ ঘাসের মাঠে তিনি ঘাম ঝরান, আবেগের বিস্ফোরণ ঘটান। তিনি কাঁদেন, রাগেন, হাসেন। অসম্ভবকে সম্ভব করেন। তাঁকে দেখে আমাদের চোখ থেকে নামে শ্রাবণের ধারা। তাঁর সুখে আমরা সুখি। তাঁর দুঃখে দুঃখী। তিনি ছুঁয়ে যান গোটা দেশকে। তাঁর জন্মদিনে বাসিত বলছেন, ''বিরাট, তুমি গ্রেট সুনীল গাভাসকর, শচীন তেণ্ডুলকরকে ফোন করো। ওঁদের কাছ থেকে জানতে চাও, সমস্যাটা ঠিক কোন জায়গায় হচ্ছে। ওঁরা তোমাকে ভুলটা ধরিয়ে দেবে।''

কোহলির সমালোচনা চলছে দেশজুড়ে। প্রাক্তনরাও নখ-দাঁত বের করছেন। প্রাক্তন পাকিস্তানি ক্রিকেটার সব দেখেশুনে বলছেন, ''ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটাররা বিরাটকে হিংসা করে। ও শূন্য করলেও ওরা কথা বলে আবার একশো করলেও। তাহলেই বুঝতে পারছেন বিরাট কোহলি কত বড় ক্রিকেটার।''
 
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বিরাট কোহলির ভারতের সামনে বড় পরীক্ষা। পারবেন কি কোহলি রানে ফিরতে? ভারতের তারকা ব্যাটারকে পরামর্শ দিয়ে বাসিত বলছেন, ''তোমার দরকার বেশি করে ম্যাচ খেলা। দলীপ ট্রফিতে নামো। চার ঘণ্টা ক্রিজে থাকো, সেশন বাই সেশন খেলো। অস্ট্রেলিয়ায় তুমি রান পাবেই।'' তখন বদলে যাবে পুরো পরিস্থিতি। 
 
৩৬-এ পা দিলেন কোহলি। প্রাক্তনরা বলছেন, বয়স বাড়ছে। শেষের পথে বিরাট-অধ্যায়। বাসিতের বক্তব্য, ''এই ৩৬-এও বিরাট সবার থেকে ফিট। ওর ফিটনেস ওর অহংকার। বিরাট ম্যাজিশিয়ান। ওকে ব্যাট করতে দেখাও আনন্দের।'' 
 
জন্মদিনে গোটা দেশের একটাই আর্তি, রানে ফেরো বিরাট। সেই আকুতি-আর্তির প্রতিধ্বনি শোনা গেল ওয়াঘার ওপারেও। অনুজের হয়ে ব্যাট ধরলেন অগ্রজ বাসিত। ৩১ বছর আগে ঠিক যেমন ঝড় তুলেছিলেন শারজায়, এই ২০২৪-এও একই ভাবে বিরাট-সমালোচকদের ফেললেন মাঠের বাইরে।